মাধ্যমিক
স্বরূপা রায়
আজ আমার মাধ্যমিকের ফলাফল বের হবে। গৃহশিক্ষক ছাড়াই
শুধুমাত্র বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাহায্যে পড়াশোনা করে পরীক্ষাটা মোটামুটি ভালোই
দিয়েছি।
আমার বাবা মারা গেছেন তিন বছর হলো। উনি দিনমজুরের কাজ
করতেন। কাজের সময়েই একদিন দুর্ঘটনায় মারা যান। বাবা বেঁচে থাকাকালীন মা গৃহবধূই
ছিলেন। কিন্তু তারপর টাকাপয়সার অভাবে মাকে কাজ শুরু করতে হয়। মা এখন পাঁচটা বাড়িতে
পরিচারিকার কাজ করে আমাদের সংসার চালান।
তাই আমাদের এই গরীবের ঘরে আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি কোনো
গৃহশিক্ষকের কাছে পড়া। আমাকে
আমার বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা খুব সাহায্য করেছেন। তারা ক্লাসে কিছু বুঝতে না পারলে আমাকে
আলাদা করে বুঝিয়ে দিতেন। অনেক শিক্ষক আমাকে বিনামূল্যে অনেক বইও দিতেন। তাই সবার
সহযোগিতায় অর্থের অভাবের প্রতিকূলতা কাটিয়ে আমি মাধ্যমিক পরীক্ষাটা দিতে
পেরেছিলাম।
মা চেয়েছিল আজকের দিনটা ছুটি নিয়ে আমার কাছে থাকবেন। কিন্তু
পরিচারিকাদের কেউ ছুটিই দিতে চায়না। মা তাই রোজকার মতোই চলে গেছেন কাজে। আর আমি
ফলাফলের অপেক্ষায় অস্থির।
দশটার সময় টেলিভিশনে ফলাফল প্রথম ঘোষণা হওয়ার কথা। আমাদের
বাড়িতে আগে টেলিভিশন ছিল,
কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার
পর একসময় টাকার জন্য ওটা আমাদের বেচতে হয়েছিল। আমি দশটা বাজতেই দৌড় দিলাম পাশের
বাড়িতে।
পাশের বাড়ির দাদু আর দিদার সাথে বসে পড়লাম টেলিভিশনের
সামনে। এখানে জানা যাবে পাশের হার কেমন আর কোন জেলা থেকে কে সর্ব্বোচ্চ দশে নিজের
জায়গা করে নিয়েছে। আর এখানেই বলে দেবে যে আমরা ইন্টারনেটে কখন ফলাফল জানতে পারবো, সেটাই আমার মূল আকর্ষণ।
একে একে ফলাফল ঘোষণা শুরু হলো। "অষ্টম হয়েছে প্রেয়সী
দাস।" এটা শুনতেই মাথাটা যেন ঘুরে গেল।
"আরে এটা তো আমার নাম।" ভাবতেই দাদু আর দিদা চিৎকার করে
বলে উঠলো, "তুই অষ্টম হয়েছিস
দিদিভাই।"
"আমার মনে হয় ওটা অন্য কেউ কিন্তু একই নাম।" আমি বললাম।
তারপর দেখা গেল যে, না ওটা আমারই নাম। আমাদের জেলায় আমি দ্বিতীয় আর রাজ্যে
অষ্টম হয়েছি। নিজেকে আর সামলাতে না পেরে দৌড় দিলাম মায়ের কাছে। মাকে যে জানাতে হবে, আমি মায়ের মুখ উজ্জ্বল করতে পেরেছি আর্থিক প্রতিবন্ধকতাকে
হারিয়ে।
(দার্জিলিং, শিলিগুড়ি-৭৩৪০০৬)

