বেড নং থার্টি সিক্স
মেহেদি হাসান মোল্লা
উত্তমবাবুর বসয় মেরেকেটে ৪৫ বছর হবে। চোখে মুখে এখনও সেভাবে বসয়ের ছাপ পড়েনি।
বয়সের চাপ বেশি না থাকলেও রক্তের চাপ কিন্তু সর্বদা আকাশ ছুঁইছুঁই। ছোট থেকে ইচ্ছা
থাকলেও পড়াশুনা খুব একটা করতে পারেননি। অভাবের সংসারে বইপত্র ফেলে ১৬ বছর বয়স থেকে
পরিবারের জোয়াল কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল। কোন রকমে ম্যাট্রিক পাশটা করেছিল। তারপর
থেকে একটা কারখানার শ্রমিক হিসাবে কাজ করে আসছেন। বিপদটা বাধে বছর পাঁচেক আগে।
সারাদিন যেন অসহ্য মাথা ব্যাথা আর মাথা ঘোরা লেগেই ছিল। ডাক্তারের কাছে গেলে বুঝে
যান যে রক্তচাপ বেড়েছে। সেইমত ওষুধও খেতে শুরু করেন। কাজের চাপে কোনদিন হয়ত ভুলেও
যেতেন। তবে নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে ভুলতেন না তিনি। কিন্তু একটা জিনিসে
কোনদিন কারোর কথা শোনেন নি। রোজ ২ প্যাকেট করে বিড়ি চাই ই চাই!
এ ব্যাপারে কারোর সু-পরামর্শ কোনদিন কর্নপাত করেননি তিনি। এইভাবেই চলছিল তার
অভাবের সংসার। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মত। তার উপর দুটো মেয়ের বিয়ে হল বছর দুই
আগে। যেটুকু সঞ্চয় করেছিলেন সবটুকু উজাড় করে মেয়ে দুটো বিদায় করেন। মেয়েদের বিয়ের
পর থেকে যেন উত্তমবাবুর কাজের প্রতি মনযোগ ক্রমশ কমতে থাকে। কি জানি কেমন যেন হাল
ছাড়া ভাব। কারখানা থেকে বারবার ফোন এলেও ধরতে চান না। সারাদিন বাড়িতে বসে বসে
নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়ছিলেন দিন কে দিন। একটা সময় কারখানার কাজ টাও হাত ছাড়া হল।
দিনরাত বাড়িতে পড়ে থাকে। অলস মস্তিষ্কে যা হয় আরকি। বিড়ি,মাদকে
দিন চলে যাচ্ছিল। দেখা হলে কেউ কেউ বলেন "উত্তমবাবু যত বুড়ো হচ্ছে ততই যেন ফুলে
ফেঁপে উঠছে"। ইদানিং পাড়ার লোক কেমন আছে জিজ্ঞসা করলে তিনি বলতেন -' রক্তে
চর্বি বেড়েছে'। সেকি কথা! রক্তে আবার চর্বি বাড়ে! গ্রামের
লোকজন যেন অবাক হয়ে যায়। চর্বিতো গায়ে হয় শুনেছি কিন্তু রক্তে চর্বি হয় এমন তো
শুনিনি বাপু।
উত্তমবাবু তাদের ব্যখ্যা করে বুঝিয়ে বলেন ডাক্তারবাবু কি যেন বলছিলেন রক্তে 'কোলেস্টল' নাকি
যেন থাকে সেটা বেড়ে গেছে। আর সেগুলো ওই শিরার মধ্যে জমে জমে গেছে। কেউ কেউ শুনে
আঁৎকে ওঠেন। উত্তমবাবু যেটা বোঝাতে চাইলেন তাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলে 'হাইপারলিপিডেমিয়া'। যে রোগে রক্তের কোলেস্টেরল, লিপিড ইত্যাদি বেড়ে যায়। কিন্তু তিনি
এতো সরল ভাবে বোঝাতে গেলেন যেটা সবাইকে আতঙ্কে ফেলে দিল। স্বল্প শিক্ষিত লোকেদের
এমন কঠিন উচ্চারন করতে সত্যই ভিমরি খাওয়ারই কথা। এমন অদ্ভুত এক রোগের কথা শুনে
চিন্তায় পাড়ার লোকের ঘুম উড়ে গেলেও উত্তমবাবুর কোন হেলদোল নেই। এমনই ভাবে চলতে
চলতে হঠাৎ একদিন রাতে তাঁর অসহ্য বুকে যন্ত্রনা শুরু হয়। বুক চেপে যন্ত্রনায়
কাতরাতে থাকে। কাউকে যে হাঁক দিকে ডাকবে সেই স্বরটুকুও গলা দিয়ে বের হচ্ছেনা।
ব্যাথার সাথে শ্বাসকষ্টও শুরু হয়। উত্তমবাবুর স্ত্রী দেখতে পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে পাড়ার লোকজন
ডেকে জোগাড় ক'রে একটা ভ্যান নিয়ে কোনক্রমে পাশের এক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করেন। ভর্তির
টিকিট করে উত্তমবাবুকে দুতলার মেডিসিন বিভাগে নিয়ে যায় বাড়ির লোকজন। কিন্তু
ওয়ার্ডে গিয়ে দেখেন কোন ফাঁকা বেড নেই। এদিকে যন্ত্রনায় ছটফট করছেন তিনি। একজনের মুখে শোনেন
ওয়ার্ডের ৩৬ নং বেডে যে রোগী ভর্তি ছিল তার আজ ছুটি হওয়ার কথা।
তাই কোন রকমে ওই বেডে উত্তমবাবুর ঠাঁই হয়। বেডে শুয়ে হাত দিয়ে বাম দিকের বুক
চেপে যন্ত্রনায় কাতরাতে থাকে আর চিৎকার করতে থাকেন। সারা শরীর ঘামে ভিজে যায় সাথে
শ্বাসকষ্ট। কাঁদতে কাঁদতে ইতিমধ্যে দুই মেয়ে এসে উপস্থিত হসপিটালে। রোগী ভর্তি
হলেও ডাক্তারবাবুর কোন দেখা নেই। ওয়ার্ডের নার্সকে খবর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন কল
ডিউটিতে থাকা ডাক্তারবাবুকে ফোন করে ডাক দেয়। কিন্তু কোন উত্তর মেলেনা। ফোন বারবার
রিং হয়ে কেটে গেলেও অন্যপার থেকে কোন সাড়া মেলেনা। এদিকে উত্তমবাবু যে নিশ্চিত
মৃত্যুর মুখে তা সবাই ঠাওর করতে পারছিল। ওই বেডে থাকা অন্য রোগীটি ভয়ে এক কোনে
গুটিশুটি মেরে বসে। বেডের পাশে তার মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে তাঁর এক মেয়ে তিতিল। আজ
তার মায়ের ছুটি হবে তাই তার মা কে বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছে। তিতিলও যেন হাঁ করে সব
ঘটনা দেখছিল। সে যেন একটু বেশি অস্থির হয়ে পড়ছিল। এদিকে উত্তমবাবুর বাড়ির লোকজন
হাঁকাচেল্লা করতে নার্স এসে শুধু অক্সিজেন মাস্ক টা মুখে লাগিয়ে ক্ষ্যান্ত।
যন্ত্রনা যেন কিছুতেই কমছেনা। বারবার উঠে বসছেন আর বুক চাপড়াচ্ছেন।
কিছুক্ষন বাদে নার্সের কাছে ফোন আসে যে অনকল ডিউটিতে থাকা ডাক্তারবাবু অন্য এক
এমারজেন্সি রোগীর ডাকে গিয়েছেন। আরো জানান যে ডাক্তারবাবুর ফিরতে একটু দেরি হবে।
কিন্তু উত্তমবাবুর উপায় কি! বাড়ির লোকজন অস্থির হয়ে উঠছে। নার্স জানিয়ে দিলেন
ডাক্তারবাবু কোন নির্দেশ না দিলে কোন ঔষধ দেওয়া যাবেনা। বাড়ির লোকজন হতাসায় প্রহর
গুনতে থাকে। কে কাকে শান্তনা দেয়! যন্ত্রনায় কাতরাতে দেখে তিতিল আর চুপ করে
দাঁড়িয়ে থাকতে পারলনা। সে ইতস্তত করতে করতে ছুটলো হসপিটালের বাইরের দিকে। হাঁপাতে
হাঁপাতে একটা ঔষধের দোকানে পৌঁছে তার যেন গলা থেকে স্বর বের হচ্ছেনা। একটু শান্ত
হয়ে দোকানদার কে বলে 'হার্টের মত দেখতে' ওই
ঔষধ দিতে। "হার্টের মত দেখতে ঔষধ নিয়ে তুমি কি করবে?" দোকানদার জিজ্ঞাসা করল। "দরকার আছে তাড়াতাড়ি দিন" তিতিল উত্তর দিল।
তিতিল যে নিছকই এই রোগটা সম্পর্কে অবগত আর উত্তমবাবুকে দেখে সেই রোগের কথা তার
মনে পড়ে গেল। তিতিলের দাদুও এই রোগের রোগী। মাঝেমধ্যে তার দাদুর যখন বুকে অসহ্য
যন্ত্রনা শুরু হয় তখনই সে ডাক্তারের দেওয়া ওই হার্ট এর মত দেখতে ঔষধ নিয়ে দাদুর
জ্বিবের তলায় দিয়ে দিত। হার্টের ব্যাথা হলে যাতে সহজে চেনা যায় ঔষধ তাই এই রকম
হার্টের মত আকার দিয়ে ঔষধ তৈরি করে কোম্পানিগুলো। তিতিলও সেটা মনে রেখেছিল। তাই সে
ছুটে দোকানে যায়। ঔষধ নিয়ে তিতিল আবার ছুটতে ছুটতে ওয়ার্ডে পৌঁছোয়। তখনও অব্দি
ডাক্তারবাবু আসেনি। ওই বেডেই পড়ে ছটফট করছেন উত্তমবাবু। সঙ্গে সঙ্গে নার্সকে না
জানিয়ে লুকিয়ে উত্তমবাবুর বাড়িরলোককে বুঝিয়ে তার জ্বিবের তলায় ঢুকিয়ে দেয় একটা
ঔষধ। সবাই তখন হতাসায় ঠায় দাঁড়িয়ে বেডের পাশে। ছোট্ট মেয়ে তিতিলের মনের জোর আর
সাহসিকতা দেখে কেউ তাকে দমিয়ে দেয়নি।
মিনিট দশেক পরে তিতিলের মায়ের ছুটির টিকিট হাতে পায়। এবার তাদের বেড খালি করে
দেওয়ার পালা। তিতিল তার মা কে নিয়ে সব গুছিয়ে বাড়ির উদ্যেশে রওনা দেয়। আসার আগে আর
একটি ঔষধ উত্তমবাবুর জ্বিবের নিচে দিয়ে চলে আসে। তিতিলের মন যেন আসতে চাইছে না।
বারবার সে পিছিন ফিরে উত্তমবাবুকে দেখার চেষ্টা করছে। সে ভাবছে কখন এই যন্ত্রনা
থেকে মুক্তি পাবে মাঝবয়সি লোকটা। ভাবতে ভাবতে তিতিল হসপিটাল ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
এদিকে উত্তমবাবুও যে যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পেল তা দেখার সৌভাগ্য হল না তিতিলের।
সন্তানতুল্য মেয়েটি যেভাবে নি:শব্দে, আত্মবিশ্বাসের উপর ভর করে
একটা প্রান ফিরিয়ে দিল তার ঋন হয়ত উত্তমবাবু কোনদিন শোধ করতে পারবেননা।
(বটতলী, গোসাবা)

