গঙ্গা আর ফিরবে না
সৌমেন সরকার
সৌমেন সরকার
গতকাল রাত থেকে গঙ্গাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পাঁচ বছরের
ছোট্ট একরত্তি মেয়েটা যে কোথায় গেল তার কোন পাত্তাই যেন মিলছেনা। ওর বাবা স্থানীয়
থানায় কমপ্লেন করেছে, এই দু’দিন যাবৎ সারা বসিরহাট এলাকা চষে ফেলেছে, তবুও তার খোঁজ মেলেনি। কাউন্সিলার থেকে শুরু করে মন্ত্রী
সকলেই আশ্বাস দিয়েছে তাকে খুঁজে দেবার।
চারিদিকে হিন্দু-মুসলিমের দাঙ্গা হাঙ্গামা চলছে ফেসবুকে ছবি না কি একটা পোস্ট করা
নিয়ে-গঙ্গার বাবা সেসব বোঝে না। তার একটা ছোট চায়ের দোকান। ওর মায়ের হাল এই দু’দিনেই কেঁদে কেঁদে মৃতপ্রায় হয়ে উঠেছে।
তিনদিন কেটে গেল। অবশেষে গঙ্গার খবর পাওয়া গেল। স্থানীয়
পুলিশ এসে জানাল যে,
মিসিং রিপোর্ট লেখানোর
তিনদিন পর তার খোঁজ মিলেছে। একটা পুরোনো বাড়ীর কুঁয়ো থেকে তার টুকরো টুকরো দেহ
উদ্ধার করেছে পুলিশ!
ওর বাবা ভাবল, তিনদিন আগেই তো যখন বসিরহাটের নানান প্রান্ত থেকে
হিন্দু-মুসলমানের খুনোখুনির খবর আসছিল তখন গঙ্গা ওই দিকেই পুরোনো বাড়ীটার কাছে
সকলের চোখের আড়ালে চলে গিয়েছিল।
কাউন্সিলার থেকে মন্ত্রী-সকলে এসে সমবেদনা জানিয়ে গেলেন। কথা
দিলেন এর একটা বিহিত হবেই। গঙ্গার বাবার হাতে দিলেন একটা এক লক্ষ টাকার চেক
ক্ষতিপূরণ হিসাবে! গঙ্গার মায়ের জ্ঞান ফিরছে না, গঙ্গার বাবা দু’চোখে সবকিছু ঝাপসা দেখছে। চেকের শক্ত কাগছটা তার কাছে একটা
ছোট্ট রাখী বলে মনে হল!
চক্রাবর্তন
সৌমেন সরকার
সৌমেন সরকার
বৃদ্ধাশ্রমের একটা শূন্য ঘরের কোণের খাটে শুয়ে নস্টালজিক হয়ে পড়লেন বছর পঁয়তাল্লিশের বৃদ্ধা সুমিতা নন্দী। যখন তাঁকে এখানে দিয়ে যায় তার একমাত্র ছেলে দীলিপ, তখন তার একমাত্র নাতি সৌরভের মুখটা মনে পড়ে। বৌমা শ্রেয়া কান্নায় ভেঙে পড়া সৌরভকে টেনে নিয়ে যায় তার বুক থেকে।
সে ফিরে যায় বছর পঁচিশ আগে। মনে পড়ে যায় তার কর্মকাণ্ড। সংসারে
আসার বছর দেড়েকের মধ্যে দীলিপ পৃথিবীতে আসে। আর তখন থেকেই সুমিতা, তার স্বামীকে বলতে থাকেন – "এই আপদ দুটোকে আমি আর টানতে পারব না। তুমি
কিছু একটা ব্যবস্থা কর। বৃদ্ধাশ্রম দিয়ে এসো ওদের।"
- "কি সব যাতা বলছ। আমাকে মানুষ করার জন্য সারা জীবনে ওরা যা
স্যাক্রিফাইস করেছে তা আমি ভুলব কি করে। স্বার্থপর হয়ে এমন কাজ অন্তত আমি করছি
না।"
বছর পাঁচেক পর সুমিতা দেবীর শ্বশুর মারা যান।আর তার পর থেকে
তার স্বামীর জীবন তিনি অতিষ্ট করে তোলেন। শর্ত জানিয়ে আল্টিমেটাম দিয়ে জানান – "মা অথবা বৌকে বেছে নিতে হবে!"
শেষে বৌ কেই বেছে নেন তার স্বামী। বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন। মাসে
টাকা পাঠান। তখন দীলিপ ছোট্ট শিশু। শুধু বলেছিল- "মা, বাবা ঠাম্মিকে তোমরা
তাড়িয়ে দিচ্ছ কেন। তাহলে আমিও বুঝি বিয়ের পর তোমাদের তাড়িয়ে দেব এভাবেই?"
তবে তাকে এখানে দিয়ে যাওয়ার আগে সম্পত্তি সব নিজের নামে
লিখিয়ে নেয় তার ছেলে দীলিপ। সেই আইডিয়াটা অবশ্য তার বৌমার, এখন তিনি এতে সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ। এখন সেসব কথা ভেবে অশ্রু
বিসর্জন করছেন সুমিতা দেবী। যদি আর পঁচিশ তিরিশ বছর তিনি বাঁচেন তবে হয়ত এই
বৃদ্ধাশ্রমেই দেখা হয়ে যেতে পারে তার ছেলে বৌমার সাথে!

