স্বজন
সুমন্ত কুন্ডু
পালবাড়ির চিলেকোঠার ছাদটা পেরিয়েও
তালগাছটার মাথা চলে গেছে আরও অনেকটা উঁচুতে। বাড়িটার সাথে গাছটার প্রায় তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের সম্পর্ক। এই বাড়ির সেও একজন সদস্য। সর্বক্ষণ গাছটা নির্নিমেষ
চোখে বাড়িটার দিকে নজর রাখে, মিলে মিশে যায় পালবাড়ির
আনন্দ-উৎসব,
বিরহ-বেদনায়। অনেকগুলো দিন কাটল এভাবে। স্থাণু বাড়ি আর স্থাণু বৃক্ষের স্থির শিকড়ে।
কালে কালে কত কি ঘটে গেল পালবাড়িতে। এলো কত সুখ-দুঃখের দিন। অনেক দেখাশোনার পর বড় মেয়েটার বিয়ে হল। কি ধুমধাম সেদিন। ছোট কর্তার ছোট ছেলেটা ভালো চাকরি পেল। একে একে সব ভাই-বোনেদের সংসার হল। পালবাড়ি মেতে উঠল আনন্দ বাসরে। কত জ্বলল আলো, কত এলো মানুষ। আনন্দবাসরের কলতান তালগাছটার শিরা উপশিরায় বেজে উঠল নিত্য নতুন সঙ্গীতে। পাতা নাড়িয়ে সে-ও মেতে উঠল আনন্দে।
দুঃখের দিনও এলো অনেক। দুই কর্তা পর পর
চোখ বুজল। কয়েক বছরের মধ্যে গিন্নিরাও। আচমকা স্ট্রোকে বাড়ি
মেজছেলেটা ভরা সংসার রেখে চলে গেল হঠাৎ। সেসব দিনে পালবাড়ি ভারাক্রান্ত হল শোকে। নীরবে চোখের জল ফেলল তাল গাছটাও। পাতা নড়ল না শোকসন্তপ্ত নীরবতায়।
ভেঙেচুরে কতকি নতুন গড়ে উঠল। বাড়িটার বাঁদিকের দেওয়ালটা ভেঙে ছোটছেলে আলাদা ঘর করে নিলো। দাওয়ার পেট বরাবর পাঁচিল তুলে এবাড়ি, ওবাড়ি
ভাগ হল একসময়। সব দেখল গাছটা। ওরও শরীরেও এলো সময়ের ক্ষয়। পাতা ঝরে গেল অনেক। আগের মতো ফল ধরল না আর।
ক’দিন আগেই বড় কর্তার ছোট ছেলে প্রস্তাব আনল
‘সামনের দিকে দু’কামরা ঘর বাড়াবো, তালগাছটা কাটতে হবে’। আপত্তি উঠল না বিশেষ। বুড়ো গাছ রেখে লাভ কি! অতএব গাছটা কাটা পড়ল।
এক মনোরম সকালে শাণিত ধারালো অস্ত্রের
আঘাতে টুকরো টুকরো করে গাছটা কেটে নিয়ে গেল কাঠ ব্যাপারি। গুঁড়ো গুঁড়ো কিছু বুকচেরা স্মৃতি শুধু ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রইল স্থাণু শিকড়ের
গোরায় । পালবাড়ির সবাই দেখল, কেউ কাঁদল না একটুও।
(আরামবাঘ, হুগলী-৭১২৪১৫)

