প্রতারণা
চিরনজিৎ সরকার
আমি,
জগাই, সোমনাথ, এবং
কেষ্ট,আমরা অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের
ছেলে। ছোটবেলা থেকে একই গ্রামে আমাদের বেড়ে ওঠা।আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা
ভালো ছিলোনা,তাই সংসারের ঘানি টানতে আমরা কেরালা
গিয়েছিলাম রোজগারের আশায়। তিন মাস কাজ করার পর পুজোর সময় আমরা বাড়িতে ফেরার
প্ল্যান করলাম।পুজোর দুদিন আগে বাড়ি ফেরার জন্য হাওড়ার টিকিট কাটলাম। নির্দিষ্ট
দিনে আমরা স্টেশনে পৌঁছালাম নিজের নিজের ব্যাগ, জরুরি জিনিস পত্র এবং উপার্জনের টাকা সাথে নিয়ে। যথা সময়ে
গাড়ি এলে সকলে গাড়িতে উঠলাম। খানিক পরে গাড়ি ছেড়ে দিলো। এরপর এক হকার গরম গরম
সিঙ্গারা নিয়ে এলো। সিঙ্গারার জন্য হাঁক মারলো জগাই।সিঙ্গারার দাম দেওয়ার জন্য সোমনাথ
উদ্যত হয়ে পকেটে হাত দিয়ে কেমন যেন হতভম্ভ হয়ে গেল।সে বলে উঠলো-আমার পার্স? আমরাও অবাক হলাম। অনেক খোঁজার পরেও পার্স পাওয়া গেলনা। সোমনাথের টিকিট পার্সের ভিতরেই ছিলো। গোটা
রাস্তা আমাদের পয়সায় ওকে খাওয়ালাম।
কিন্তু সোমনাথ গভীর চিন্তামগ্ন টিকিট ছাড়া ও কিভাবে হাওড়া
স্টেশন থেকে বার হবে?
এই প্রশ্ন সবাইকে কুঁড়ে
কুঁড়ে খাচ্ছিল। অবশেষে কেষ্ট বললো-আমরা স্টেশনে পৌঁছনোর পর সবাই এক জায়গায় বসে
থাকবো, আর তুই আমার টিকিট নিয়ে কাউন্টারে গিয়ে একটা
প্ল্যাটফর্ম টিকিট কেটে নিয়ে আসবি, টিটিবাবু ধরলে বলবি আমি এদেরকে নিতে এসেছি।ওর প্ল্যানটা
শুনে সবাই কিছুটা নিশ্চিন্ত হলাম।অবশেষে আমরা হাওড়ায় পৌছালাম।কেষ্টর প্ল্যানটা
পুরোপুরি সাকসেস হলো। যাই হোক এ যাত্রায় বাঁচা গেল। স্টেশনের বাইরে এসে শিয়ালদার
উদ্দেশ্যে বাস ধরলাম। শিয়ালদা পৌঁছানোর পর
স্টেশনের উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগলাম। একটা অপরিচিত লোক চলতি পথে জগাইয়ের সাথে
কথোপকথনে বেশ ভাব জমিয়ে ফেললো। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন-তোমরা কোথায় যাবে? আমি উত্তরে বললাম-আমারা বনগাঁ যাবো। লোকটিও গলা মিলিয়ে
বললো-আমিও বারাসাত যাবো।একই লাইনে বেশ ভালোই হবে, সহযাত্রী পেলাম।কথাটি শুনে আমরাও বেশ খুশি হলাম। এভাবেই
আলাপ করতে করতে পথ চলছি হঠাৎ আমার চোখে পড়লো, হাজার টাকার নোটের একটা বাণ্ডিল রাস্তায় পড়ে আছে।লোকটি
এগিয়ে গিয়ে বাণ্ডিলটা তুলে নিজের ব্যাগের মধ্যে রাখলেন।
তারপর কিছুক্ষন সকলে চুপ থাকার পর ভদ্রলোক বললেন-আমরা সকলে
একসাথে চলতে চলতে টাকাটা পেয়েছি, অতএব
এই টাকার অংশীদার তোমরাও। কথাটি আমাদের সকলের উৎসাহ বাড়িয়ে দিল। স্টেশনের
মুখোমুখি হতেই তিনি বললেন-এতো গুলো টাকা ভিঁড় ট্রেনের মধ্যে কি করে ভাগ করবো, তার থেকে চলো ট্যাক্সি ধরে অন্যত্র যাই। আমরাও ভদ্রলোকের
কথা মত চললাম ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে। যথারীতি ট্যাক্সি ধরে সকলে গাড়িতে উঠে
বসলাম।গাড়ি চলতে না চলতেই একটি বাইপাসের পাশে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে তিনি আমাকে
ব্যাগের চেন খুলে টাকা দেখিয়ে ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে বললেন-তোমরা ব্যাগটা নিয়ে
তিন জনে নেমে যাও,
এই বাইপাস দিয়েই আমাদেরকে
যেতে হবে। আর কেষ্ট কে দেখিয়ে বললেন-এই ভাইটাকে সাথে নিয়ে যাচ্ছি সামনে একটা হোটেল
আছে,সেখান থেকে জল খাবার নিয়ে আবার সকলে একসাথে
ফিরব। আমরাও ভাবলাম,
তাইতো এত গুলো টাকা সমেত
ব্যাগটা যখন আমাদের কাছে রেখে যাচ্ছেন তাহলে আর কিসের চিন্তা। আমরা নেমে পড়লাম
গাড়ি থেকে। গাড়ি চলে যাওয়ার কিছুক্ষন পর আমাদের কেমন একটা সন্দেহ হলো, ব্যাগটা হাতড়ে দেখতে লাগলাম। হাতে কিছু ঠাহর পাচ্ছিলাম না
বলে তালা মারা ব্যাগের চেনটা ছিঁড়ে ফেলতেই সকলের চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল। কোথায় টাকা, আরও ভালো করে খুঁজছি, এমন সময় কেষ্ট এসে হাজির হলো খালি হাতে, ও আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করলো কি হয়েছে, আমাদের মুখ দেখে কেষ্ট বুঝতে পেরেছে যে আমাদের সাথে চরম
প্রতারণা হয়েছে,
কেষ্টর এই ভাবে চলে আসার
কারণ জিজ্ঞাসা করতেই ও বললো তোদের মত আমাকেও ব্যাগের টাকার গল্প শুনিয়ে পাঠিয়ে
দিয়েছে। কলকাতার রাস্তায় আমরা উন্মাদের মতো দিশাহারা হয়ে গিয়েছিলাম।
খালি হাতে খালি পকেটে আমরা সকলে স্টেশনে এসে বিনা টিকিটে
বনগাঁ লোকাল ধরে বনগাঁ পৌছালাম।

